Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts
Showing posts with label ভ্রমণ. Show all posts

Tuesday, July 1, 2014

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ ভ্রমণ-১

কোলকাতা আর দার্জিলিং ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গত ২ জুন রাত ১১ টায় গ্রীনলাইন বাসে করে রওনা দিয়েছিলাম বেনাপোলের উদ্দেশে। পুরো ব্যাচ থেকে কোলকাতা, আগ্রা, দিল্লি ও কাশ্মীর ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল আমাদের। সে লক্ষ্যেই ভারতের ভিসা করানো হয়। কিন্তু শেষ মূহুর্তে উত্তর ভারত থেকে রেলের ফিরতি টিকেট না পাওয়া যাওয়া পিছিয়ে যায় ট্যুর। তাই আপাতত হাতের কাছের কোলকাতা ও দার্জিলিং এই সাধ মেটানোর পরিকল্পনা করি আমরা তিন বন্ধু। আমি, শ্রাবণ ও মিশু। ৭-১০ দিন থাকার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। আমি যেখানে জীবনেও কোনো কাজের জন্য কোনো প্রকার প্রস্তুতি নিই না, সেই আমি এ যাত্রা ছোটখাটো এক মহাপ্রস্তুতি গ্রহণ করে ফেললাম। দার্জিলিং এ নাকি তখন বৃষ্টির মৌসুম। দেরি না করে জুতার বাক্সে পড়ে থাকার রাবারের ছেঁড়া স্যান্ডেলটা সেলাই করে নিয়ে আসলাম। প্যান্ট সংকটে ভুগছিল ক’দিন ধরেই। বিদেশ-বিভূঁইয়ে গিয়ে প্যান্ট সংক্রান্ত আপদ থেকে মুক্তি পেতে দু’খানা প্যান্ট খরিদ করলাম ধানমন্ডির বিগ বস থেকে। আমি যেহেতু ঘাড়ে-গর্দানে বিগ বস সেহেতু সহজে নিউ মার্কেট এলাকায় আমার প্যান্ট পাওয়া যায় না আজকাল। বিগ বসেই ধরনা দিতে হয়। একটা গ্যাবার্ডিন আর একটা জিন্স। সবকিছু রেডি করে খেয়াল করলাম যাত্রাপথে কান খোঁচানো অতি জরুরি একটা কাজ। সেজন্য ফুটপাত থেকে দু’ প্যাকেট কটন বাড কিনে ফেললাম। কান খোঁচানোর সময়ে যে জাগতিক সুখ লাভ করা যায় তা যারা কান খোঁচাতে অভ্যস্ত তারা ভালোই জানেন।

বাসের টিকেট কাটা হয়েছিল যাত্রার দু’দিন আগে। ঢাকা থেকে বেনাপোল ১২০০ টাকা আর সীমান্ত পার হয়ে ওদিকে হরিদাসপুর থেকে কোলকাতা যাওয়ার জন্য গুনতে হবে আরো ২৮০ রুপি। টিকেট হাতে পাওয়ার পর আমার ভ্রমণসঙ্গী বন্ধু মিশু উত্তেজনায় প্রত্যহ ৩-৪ বার ফোন দেয়া শুরু করে দিয়েছিল। ট্যুর উপলক্ষে সে একখানা বিরাট সাইজের লুঙ্গি খরিদ করেছে। বন্ধু-বান্ধবের সামনে কাপড় বদলানোর এর চেয়ে ভালো উপার আর কী আছে? আমি নিয়মিত লুঙ্গি পরি বিধায় লুঙ্গির সংকট আমার কখনই হয় না। আরেক বন্ধু শ্রাবণ বর্ষাতি কেনার জন্য চাংখারপুল ও বঙ্গবাজার এলাকায় টহল দেয়া শুরু করলো। ঐ এলাকায় যাওয়ার ক্ষেত্রে তার অন্য আরেকটা উদ্দেশ্যও ছিল। সেটি হলো হোটেল আল-রাজ্জাকে দুপুরের খানা খাওয়া।

যাই হোক, সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্ধারিত দিনে পান্থপথের বাস কাউন্টারে হাজির হলাম। কিন্তু বাসের আর দেখা নেই। রাত ১১ টার বাস কাউন্টারে হাজির হলো ১ টায়। শুরুতেই ২ ঘন্টা দেরি। অতঃপর আমাদের সাধের ভারত ভ্রমণ শুরু হলো। চলছি তো চলছিই। ভোর হওয়ার আগে আগে পৌঁছালাম পাটুরিয়া ফেরিঘাটে। সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হলো। আস্তে আস্তে বাস এগোচ্ছে। বিশাল লাইন। বাস থেকে হাঁটাহাঁটিও করলাম কিছুক্ষণ। এক সময় ফেরিতে উঠলাম। বেশ খিদে পেয়েছে ততক্ষণে। ফেরিতে কিছু খেয়ে পেট খারাপ হবে এ ভয়ে আর কিছু খাওয়া হলো না। ফেরি দৌলতদিয়া ঘাটে পৌঁছানোর আগেই আলো ফুটতে শুরু করলো। থাকতে না পেরে ১০ টাকার একটা জাম্বো ঝালমুড়ি নিয়ে নিলাম। আয়েশ করে খেতে খেতে ঘাটে নামলাম আমরা। এরপর আবারো যাচ্ছি তো যাচ্ছিই। পথ আর ফুরোয় না। ফরিদপুর শেষ করে যশোরের কোনো এক বন্ধ পেট্রোল পাম্পের সামনে বাস গেল নষ্ট হয়ে। এসি বন্ধ। গরমে ঘামছি। কিছুক্ষণ পর ঘামের সাথে যোগ দিল বৃষ্টির পানি। এসি বাসের ফাঁকফোঁকর দিয়ে সমানে পানি ঢুকছে বাসে। বাসভর্তি যাত্রী গ্রীন লাইনকে গালাগালি শুরু করে দিয়েছে। সুপারভাইজার সাহেব আশ্বাস দিলেন আরেকটি বাস আমাদের উদ্ধার করতে রওনা হয়েছে। সে বাসেরও দেখা নেই। ঘন্টাখানেক রাস্তার মাঝখানে বসে থেকে উদ্ধারকারী বাস হাজির হলো। আমরা ভিজে ভিজে বাস বদলালাম। নতুন বাসে যেতে যেতে যাত্রীরা প্রচণ্ড ক্ষুধা অনুভব করলো। এ অবস্থায় যাত্রীদের মাঝে দু’টো দল তৈরি হলো। এক দল চায় খাওয়ার জন্য হোটেলে বাস থামাতে, আরেক দল বাস থামাতে নারাজ। অনেক দেরি হয়েছে, আর দেরি মেনে নেয়া যায় না। উল্লেখ্য, তাদের সাথে গাট্টি-বোঁচকা ভর্তি খাবার। অবশেষে অনেক হৈ চৈ করে বাস একটা হোটেলের সামনে থামানো হলো। সে হোটেলে ঢুকে দেখা গেল তাদের চুলা বন্ধ। কোনো খাবার নেই। তুমুল বৃষ্টিতে রাস্তার অপর পাশে আরেকটু ছোট্ট গ্রামীণ হোটেলে রাবার গরুর মাংস দিয়ে আটা রুটি কোনোমতে নাকেমুখে গোঁজা হলো। এরপর বাসে চেপে একবারে বেনাপোল সীমান্তে।

Benapole-Port-

(চলবে)

Sunday, May 25, 2014

একটি চিরাচরিত ‘ঘুরে এলাম অমুক জায়গা’ টাইপ লেখা- ৫ম ও শেষ পর্ব

মার্কেটে রাখাইনদের দোকান বলতে গেলে আর নেই। সব বাঙালিদের দখলে। আমরা খুঁজে খুঁজে রাখাইনদের দোকান খুঁজে বের করলাম। বড্ড ভালো লাগে তাদের দোকানে গেলে। বুদ্ধিমান পাঠক আশা করি বুঝে গিয়েছেন, খুলে বলতে হবে না। মার্কেট ঘোরা আমার খুব অপছন্দের কাজ। কিন্তু ভালোই লাগছিল সেখানে। রাখাইন দোকানীদের কথাবার্তা এতো সুন্দর। মন ভালো হয়ে যায়। জিনিসপত্র কিনে সোজা হোটেলে চলে গেলাম। সব কিছু রেখে পুনরায় চলে আসলাম লাবণী পয়েন্টে। সেখান কড়ি-টড়ি কেনা হবে। ঘুরে ঘুরে তাও কেনা হলো। এরপর অটোতে করে যাওয়া হলো মারমেইড ক্যাফেতে। তাদের অন্দরসজ্জা সুন্দর বিধায় যাওয়া হয়েছিল। সব কিছুর দাম আকাশচুম্বী। তিনটা লেমোনেড অর্ডার করা হলো। বসতে অসাধারণ লাগে। মেনুতে লেখা সব খাবারের ওপর ১০ শতাংশ সার্ভিজ চার্জ এবং ৬ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। ভালো কথা। আমরা হিসাব করে ফেললাম কত টাকা বিল আসবে। লেমোনেড আসলো। বিল দিতে বললাম কেননা একটু তাড়াহুড়ো ছিল আমাদের। রাতের খাবার খেতে যেতে হবে। দেখলাম বিল এসেছে কাঙ্ক্ষিত টাকার চেয়ে ২ টাকা বেশি। পরে আমি আবিষ্কার করলাম তারা খাবারের দামের ওপর সার্ভিজ চার্জ আরোপ করেছে। এরপর সার্ভিস চার্জসহ মোট দামের ওপর আরোপ করেছে ভ্যাট। পুরা বাটপার। এখানেই শেষ নয়। ২৯৮ টাকা বিল এসেছে। ৫০০ টাকা দেয়ার পর ফেরত এনেছে ২০০ টাকা। ২ টাকা গায়েব। আমি তো অত সহজে ছাড়ার পাত্র নই। ওয়েটারকে ডেকে ২ টাকার কথা বললাম। আমার বন্ধুরা খুব বিরক্ত হলো। কিন্তু ২ টাকা কম দিবে কেন? ২ টাকা নিয়ে বের হয়ে আসলাম। রাতে খেলাম পউষীতেই। এবারে আমার বন্ধুরা নিলো একটা করে লইট্টা ফ্রাই আর একটা করে রূপচাঁদা। আমি লইট্টা ফ্রাইয়ের সাথে নিলাম গরুর ভুনা। সবগুলো খাবার স্বাদই অসাধারণ। ভরপেট খেয়ে হোটেলে ফিরে এলাম। পরদিন দুপুর ১২ টায় বিআরটিসি বাসে করে চট্টগ্রাম যেতে হবে।

3577517

জিইসি মোড়

১২ টার বাস ধরতেই আমাদের হিমশিম খাওয়া অবস্থা। ঘুম থেকে উঠলাম সাড়ে ১০ টায়। কোনো মতে রঁসুই ঘরে দুই বন্ধু নাশতা সারলাম। তৃতীয় বন্ধু যথারীতি ঘুমালো। অতঃপর হোটেলে ফিরে সব গোছগাছ করে বিআরটিসির কাউন্টারে গেলাম। সরকারি কোম্পানি তা তার চেহারা দেখেই বোঝা যায়। লাগেজ রাখার কম্পার্টমেন্টে একটা আস্ত স্যুটকেসও আঁটে না। আরো মজার ব্যাপার হলো সেই কম্পার্টমেন্টে তালা লাগানোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ছিটকিনি সিস্টেম। পাক্কা সরকারি। বিআরটিসির এসি বাস। জানালাও খোলা যায়। বুঝলাম, সময়ে সময়ে তা নন-এসিতে পরিণত হতে পারে। আমাদের আশংকার সত্যে পরিণত হলো চিটাগাং শহরে পৌঁছানোর পর। প্রচণ্ড বৃষ্টিতে রাস্তায় কোমর সমান পানি। বাঘা বাঘা সোহাগ, বাগদাদ এক্সপ্রেসের বাস সারি ধরে ফ্লাইওভারের ওপরে থেমে আছে। নিচে নামছে না পানির ভয়ে। পানিতে নামলেই ইঞ্জিনে পানি প্রবেশ করে অচল হয়ে যাবে বাস। পাক্কা দুই ঘন্টা বাস ফ্লাইওভারের ওপরে। বাস থেকে নেমে হেঁটে বেড়াচ্ছি। একটা শসা, গাজরের ট্রাকও থেমে আছে। লোকজন সেখান থেকে নিয়ে নিয়ে শসা গাজর চিবুচ্ছে। অতঃপর পানি না কমলেও আমাদের ড্রাইভার সিদ্ধান্ত নিলো সামনের বাসগুলোর পাশ কাটিয়ে পানির ওপর দিয়েই বাস নেবে। এক যাত্রী চিৎকার করে বলে উঠলো “He is a brave Driver”. আমাদের ব্রেভ ড্রাইভার বীরত্বের সাথে পানির ওপর দিয়ে বাস টেনে নিয়ে আমাদের জিইসি মোড়ে নামিয়ে দিলো। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয় হয়। বিকেল ৪ টার পরিবর্তে সন্ধ্যা ৭ টায় পৌঁছালাম চিটাগাং এ বন্ধুর বাসায়। বন্ধুর মা অর্থাৎ খালাম্মা অসাধারণ সব আইটেম তৈরি করে রেখেছিলেন আমাদের জন্য। ঝরঝরে খিচুড়ি, মুরগির মাংস ভুনা আর গরুর ঝাল মাংস। সাথে আমের আচার এবং আম মাখা। চিংড়ি দিয়ে সবজিও ছিল। গপাগপ গিলতে লাগলাম সব। গলা পর্যন্ত খেয়ে এক কাপ চা। বুকে তখন সুখের মতন ব্যথা।

handi-restaurant orig_218bab8ebde8a5d8b90a00a8d5638a5082d25dfe

পরদিন ভোরে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে ঢাকা ফিরবো। টিকেট যথারীতি নেই। বন্ধুর চাচা ৩ টা টিকেট ম্যানেজ করে দিলেন। আমরা খাওয়া-দাওয়া সেরে শহরের ভেতরেই ঘুরতে বের হলাম। আমিরবাগ এলাকা টহল দিলাম। হঠাৎ দু’ বন্ধু প্রস্তাব করে বসলো হান্ডিতে খাওয়ার। চট্টগ্রামে এসে হান্ডিতে না খেলেই নয়। আরেক বন্ধুর কাছে ফোন করে খোঁজ নিলাম হান্ডির কী কী আইটেম খাবো। তার পরামর্শেই অর্ডার করলাম হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি আর ফালুদা। আরো অর্ডার করা হলো কাজু বাদামের সালাদ আর কুলফি। কাজু বাদামের সালাদ ছিল চমৎকার। প্রচুর মুরগির মাংস দেয়া তাতে। আর হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানিটা আমার এখন পর্যন্ত খাওয়া সেরা হায়দ্রাবাদী বিরিয়ানি। অসাধারণ স্বাদ। ওপরে কাজু বাদাম ছড়ানো। সাথে সুন্দর করে সেদ্ধ ডিম দিয়ে ডেকোরেশন করা। ভেতরে ৪ টুকরো খাসির পিস। এক কথায় অপূর্ব। আর খাওয়া শেষে কুলফি আর ফালুদা যে কী লাগলো তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। ঢেঁক তুলতে তুলতে বের হলাম। বাসায় ফিরে ঘুম দিলাম। সকাল ৬ টা ৪০ এ বাস।

ভোরে ওঠা আমাদের সবার জন্যেই কষ্টকর। কষ্ট করে ৬ টায় উঠে ৬ টা ৩৮ এ সিএনজিতে করে পৌঁছালাম রেল স্টেশনে। বগি পর্যন্ত যেতে যেতে ট্রেন চলা শুরু করলো। কোনোমতে একটা বগিতে উঠে ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছালাম নিজেদের বগিতে। দুপুর ১ টায় পৌঁছালাম ঢাকায়। শেষ হলো আমাদের ৩ বন্ধুর অসাধারণ এক কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম সফর।

Saturday, May 24, 2014

একটি চিরাচরিত ‘ঘুরে এলাম অমুক জায়গা’ টাইপ লেখা- ৪র্থ পর্ব

হিমছড়িতে পৌঁছেই ঝর্ণা খোঁজা শুরু করে দিলাম। দেখলাম ১৩ বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ঢোকার গেইট হয়েছে। ঝর্ণা দেখার কম্পাউন্ডে ঢুকতে ২৩ টাকার টিকেট কিনতে হয়। ১৫ টাকা টিকেটের দাম আর বাকিটা ভ্যাট (ভ্যাট আর শান্তি দিলো না)। গেইট দিয়ে প্রবেশ করতে দেখলাম তীর চিহ্ন দিয়ে বড় ঝর্ণার দিকে যাওয়ার পথ। ঝর্ণা সামনে গিয়ে আমি যারপরনাই অবাক হয়েছি। এতোটুকুন হয়ে গিয়েছে ঝর্ণা। চেনার কোনো উপায় নেই। ঝর্ণার উচ্চতা আমার চেয়ে একটু বেশি হবে। পাহাড় ভেঙে ঝর্ণা ছোট হয়ে গিয়েছে। ঝর্ণার উৎসের দিকে যাওয়াও নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে মিনি ঝর্ণায় একটু হাত-পা ভেজালাম। ক্যামেরা নেই, ছবি তোলা হলো না। স্থানীয় ফটোগ্রাফাররা ছবি তুলে মেমরি কার্ডে দিতে চাইলো, কিন্তু সে বস্তুও আমাদের সাথে নেই। অতঃপর সিঁড়ি বেয়ে পাহাড়ে ওঠার প্রস্তুতি নিলাম। উঠছি তো উঠছি, সিঁড়ি আর শেষ হয় না। হাঁসফাঁস অবস্থা আমার! আর পারি না। মানুষজনও দেখি সব হাঁপাচ্ছে। প্রায় শেষ পর্যন্ত ওঠার পর একটা সমতল জায়গায় আমার বন্ধুরা ডাবের পানি পান করলো। খালি হাতে উঠতেই যেখানে খবর হয়ে যায় সেখানে ডাবওয়ালা কীভাবে প্রতিদিন একগাদা ডাব নিয়ে উঠে আমার কোনো ধারণা নেই। আমি আর পারছিলাম না উঠতে। আমার বন্ধুরা চূঁড়ায় উঠলো। আমি নেমে এসে সমুদ্র সৈকতের পাড়ে বালির বস্তার ওপর শুয়ে পড়লাম। বুক ভরে বাতাস নিলাম। হানিমুনে আসা নবদম্পতিদের আড়চোখে লক্ষ্য করলাম। তাদের আনন্দে আমিই যেন আনন্দিত হয়ে পড়ছিলাম। প্রায় ৪৫ মিনিট একা একা খুব চমৎকার একটা সময় কাটালাম সাগড় পাড়ে। আকাশে তখন ঘন মেঘ। রোদের জন্যে তাকানোও যায় না ভালো করে। রোদ চশমাই ভরসা। এরমধ্যে আমার বন্ধুরা আমাকে ফোন দিয়ে অটো স্ট্যান্ডে যেতে বললো। ইচ্ছে ছিল সাগর পাড়ে বসে এক গেলাস জুস পান করবো। সে সুযোগ না দিয়ে তারা ১২০ টাকায় লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত অটো ঠিক করে ফেললো। মনোরম পথ ধরে লাবণীতে পৌঁছালাম।

index

cms.somewhereinblog.net

এক বন্ধুর ওপর ফরমায়েশ ছিল বার্মিজ বিছানার চাদর কেনার। সাগড় পাড়ের দোকানে কিছু পছন্দ না হওয়ায় অটোতে করে চলে গেলাম শহরে। আমাদের জানা ছিল কক্সবাজারে বার্মিজ মার্কেট একটাই। কিন্তু শহরে প্রবেশ করে একের পর এক বার্মিজ মার্কেট দেখে তো আমরা হতবাক। “আলমাস বার্মিজ মার্কেট”, “রতন বার্মিজ মার্কেট”সহ আরো কত পদের বার্মিজ মার্কেটের সমাহার সেখানে। শহরে প্রবেশ করার পর থেকেই লক্ষ্য করছিলাম বয়স্ক রাখাইন মহিলারা কোন দিক থেকে যেন আসছেন। এদিকে মার্কেটের গায়েও দেখলাম ঠিকানা লেখা ‘বৌদ্ধ মন্দির সড়ক’। বন্ধুদের এক রকম জোর করেই বৌদ্ধ মন্দির খোঁজার অভিযানে শরিক করলাম। পেয়েও গেলাম এক সময়। বাঙালিদের সেখানে প্রবেশ করতে না দেখে তারা অত্যন্ত ভীত। ঢুকতে পারবো কিনা তা নিয়ে সংশয় থাকা সত্ত্বেও ঢুলে পড়লাম। প্রধান দরজা পার হতেই চলে এলাম দুই থেকে তিনশ’ বছর আগে। আধুনিক শহর আর প্রযুক্তিময় কৃত্রিমতার কোনো ছোঁয়া সেখানে নেই। মনে হচ্ছিল তিব্বতের নিঝুম কোনো মন্দিরে যেন চলে এলাম। ল্যাপটপ, কম্পিউটার, টেলিভিশন, মোবাইলের সভ্যতা এখানে পৌঁছায় নি। অদ্ভুত এক শান্তি কাজ করছি। কিছু দূর এগোতে এক মহিলা আমাদের স্যান্ডেল খুলে রেখে বললেন। আমরা খালিয়ে পায়ে ঘুরে দেখলাম গোটা মন্দির। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা তাদের শান্ত-সৌম্য-পাণ্ডিত্যপূর্ণ দৃষ্টিতে আমাদের দেখছিলেন। শুনলাম একটু পরেই প্রার্থনা শুরু হবে। এর আগেই বেরোতে হবে আমাদের। এর মধ্যে মাগরিবের আযানও শুনতে পেলাম কাছে মসজিদ থেকে। রাখাইন তরুণীরা অদ্ভূত এক ধরণের জলাধার থেকে পানি নিয়ে হাতমুখ ধুচ্ছিল। আমার বুকের ভেতরে তখন অদ্ভুত এক হাহাকার যেন। বিদ্যুৎ ছিল না। মোমবাতি জ্বলছে ঘরে ঘরে। আলো ছায়ার এক রহস্যময় পরিবেশ। এর মাঝে অনিন্দ্য সুন্দরী রাখাইন তরুণীরা। সব মিলিয়ে আমি অভিভূত। এক বাঙালি গাইড নিজে থেকে আমাদের কয়েকটি বুদ্ধ মূর্তি দেখালো। পালি ভাষায় লেখা কয়েকটি লাইনও রয়েছে মন্দিরের বিভিন্ন কক্ষের সামনে। একটি কক্ষে দেখলাম ছোট ছোট পাত্রের পানিতে ফুলের পাপড়ি রাখা। গাইড বললো, রাখাইন তরুণ-তরুণীরা মনে মনে একটা ইচ্ছা করে এখানে মন্ত্র পড়ে ফুল রেখে গেলে তাদের বিশ্বাস মনের আশা পূর্ণ হবে। মন্দির ঘোরা শেষে বের হওয়ার সময় বাঙালি গাইড অর্থ চেয়ে বসলো। দুইশ’ টাকা দিয়েও তার মন ভরানো গেল না। আরো ২০ টাকা দিয়ে কোনোমতে বের হয়ে এলাম আমরা। এরপর পাশের রাখাইন পল্লী ঘুরে দেখলাম ৫ মিনিটের জন্য।

(চলবে)

Thursday, May 15, 2014

একটি চিরাচরিত ‘ঘুরে এলাম অমুক জায়গা’ টাইপ লেখা- ২য় পর্ব

সঙ্গীত চর্চা করতে করতে একেবারে কলাতলী পয়েন্টে চলে আসলাম আমরা। সেখান থেকে রিক্সা নেব না অটো নেব সে সিদ্ধান্থীনতায় কাটলো অনেকটা ক্ষণ। অতঃপর দু’টা রিক্সা নিয়ে ফিরে এলাম সুগন্ধা পয়েন্টের হোটেলে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম রাতের খাবারের সন্ধানে। কিছুটা দূরে বিধায় ধানসিঁড়ি রেঁস্তোরায় না গিয়ে হাঁটাপথে খাওয়ার হোটেল খুঁজতে লাগলাম। লুঙ্গি পরিহিত এক ব্যক্তি স্থানীয় জান্নাত হোটেলের কার্ড ধরিয়ে দিলেন। এতো ক্লান্ত বোধ করছিলাম যে ভালোমন্দ যাচাই না করে ঢুকে পড়লাম সেখানে। ওয়েটার বাবাজি অনেকক্ষণ পর হোটেলের বাইরে থেকে প্রবেশ করলেন। আমরা ছাড়া কোনো কাস্টমার নেই সেখানে। হিসাব-নিকাশ করে ডাল আর ভাতের সাথে অর্ডার করলাম ভর্তা-ভাজি। কক্সবাজার যখন এসেছি রূপচান্দা ফ্রাই যত দামই হোক, একটু চেখে দেখা দরকার সে আশায় অর্ডার করলাম। আকাশচুম্বী দাম। ৩০০ টাকা। ওয়েটার সাহেব বললেন রূপচান্দা আসতে দেরি হবে। কতক্ষণের জবাবে বললেন ১০ মিনিট। আমার চাটগাঁইয়া বন্ধু পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো, “১০ মিনিট মানে কি ১০ মিনিট?” এবার মাথা চুলকাতে চুলকাতে ওয়েটার বললেন ইয়ে মানে ১৫ মিনিট। আমরা ভর্তা ভাজি দিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। টমেটো ভর্তাটা এখনও মুখে লেগে আছে। অন্যান্য আইটেম ততটা ভালো লাগে নি। খাওয়া শেষ হওয়ার পর আসলো রূপচাঁদা। তিন জন মিলে সেটাকে নিমিষে সাবাড় করলাম। দাম মিটিয়ে হোটেলের পথে হাঁটা দিলাম।

cox-bazer-24

ভাবছিলাম একটা ঠান্ডা কোক নিয়ে হোটেলে ফিরি। আমাদের মতিগতি ধরে ফেললো এক চাল্লু দোকানদার। ডাক দিলো ঠান্ডা কিছু লাগবে নাকি বলে। তার দোকানে সব কিছুর দাম বাড়তি। আবার মোটের ওপরও দুই টাকা বেশি রাখতে চায়। তার বক্তব্য হলো, সে আমাদের ছোট ভাই। ট্যুরিস্ট এলাকা। দাম একটু বাড়তি। আমরা বললাম যেহেতু আমরা তার বড় ভাই তাইলে দাম একটু কম রাখেন। এবার তার নাকি কান্না। সে গরিব মানুষ। দোকান তার না। দোকানে সে চাকরি করে। খাতির করে সে চা খাওয়াতে পারবে কিন্তু দাম কম রাখতে পারবে না। তারপরও ভুং চুং করে ৫ টাকা কমানো হলো। কঠিন চাল্লু পাবলিক সে। হোটেলে ফিরে ৩ বন্ধু কোকা কোলা পান করতে করতে টিভিতে ট্রাভেল অ্যান্ড লিভিং দেখার ব্যর্থ চেষ্টা করে অতঃপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

coxs-bazar-sunset-dhaka-city

আমার বন্ধুদের পরিকল্পনা ছিল তারা পর দিন খুব ভোরে উঠে সমুদ্র সৈকতে সূর্যোদয় দেখার পাশাপাশি জগিং করবে। কীসের কী! সাড়ে ১০ টায় ঘুম থেকে জেগে দেখি আমিই ফার্স্ট। দুইজন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। এদিকে রাতে এলাকার ভোল্টেজ আপ ডাউন করায় এসি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ফ্যান একটু চলে তো একটু থামে অবস্থা। ফলে কারোরই ঘুম ভালো হয় নি। দু’জনকে জাগানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে নিজেই নাস্তা খেতে বেরিয়ে পড়লাম। হোটেলের সামনের সাথী রেঁস্তোরায় একমাত্র কাস্টমার হিসেবে প্রবেশ করলাম। পরোটা, ডিম ভাজি আর সবজি দিয়ে নাস্তা সারলাম। এরপর বাইরে এসে পান করলাম এক কাপ অদ্ভুত স্বাদের চা। মনে হচ্ছিল চায়ের মধ্যে চিনি না দিয়ে সরাসরি আখের রস ঢালা হয়েছে। নাস্তা সেরে রুমে ফিরে দেখি দুই বান্দা তখনও ঘুমাচ্ছে। একজনকে ওঠানো গেল। অপরজন বেহুঁশ। যেই জন উঠলেন তার সাথে দ্বিতীয় নাস্তা সারতে বের হলাম। ধানসিঁড়িতে গিয়ে শুনলাম নাস্তা শেষ। থাকবেই বা কী করে? তখন বাজে দুপুর ১২ টা। নাস্তা নেই কিন্তু তাদের ফ্রিজে দেখলাম মিক্সড ফ্রুট নামে এক ডেজার্ট রাখা। কক্সবাজারের সব রেঁস্তোরাতেই এ জিনিস মিলবে। জিনিসটা আসলে কাস্টার্ড। দাম ৬০ টাকা। দু’ বন্ধু মিলে একটা মিক্সড ফ্রুট খেলাম। নাস্তা না পাওয়ার বিরহে বের হলাম। ইলশে গুঁড়ি শুরু হলো। রঁসুই ঘর নামে এক হোটেলে ঢুকে জানতে পারলাম নাস্তা আছে। বসে পড়লাম। আমি পরোটা খেলাম চায়ে ডুবিয়ে, বন্ধু ডিম পোচ দিয়ে পরোটা। বের হওয়ার সময় দেখলাম সেখানে বেলিসিমোর একটা ফ্রিজ আছে। অতিরিক্তি খাওয়ায় হালকা বমি ভাব হচ্ছিল। আইসক্রিম খেলে ভালো লাগবে এ আশায় (আসলে আইসক্রিম খেতে ইচ্ছা করছিল) দু’জন দু’টা মিনি চকবার যেটার নাম সম্ভবত ‘জি’ নিয়ে ফেললাম। খেতে খেতে হোটেলের দিকে ফিরলাম।

বুদ্ধিমান পাঠক নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে ধরে ফেলেছেন যে আমাদের কক্সবাজার ভ্রমণে ঘোরাঘুরির চেয়ে খাওয়াই ছিল বেশি। পরের পর্বে হাজির হচ্ছি পৌষী রেঁস্তোরায় উদরপূর্তি আর হিমছড়ি ট্রিপ নিয়ে।

(চলবে)

Monday, May 12, 2014

একটি চিরাচরিত 'ঘুরে এলাম অমুক জায়গা' টাইপ লেখা- ১ম পর্ব

পড়াশুনা শেষ। বেকার বন্ধুদের তালিকায় নাম লেখায় ফেললাম। কোথাও ঘুরতে যাওয়ার জন্য আদর্শ সময়। নো পরীক্ষা, নো ক্লাস, নো অ্যাসাইনমেন্ট। কই যাবো কই যাবো করতে করতে পান্থপথ এলাকার কোনো এক টং দোকানে চা (আসলে শরবত) খেতে খেতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম কক্সবাজারেই যাবো। ইচ্ছা ছিল বান্দরবান বা সিলেট যাওয়ার। কিন্তু সেখানে গিয়ে আবার গাড়ি ভাড়া করে এখানে সেখানে যাওয়া সম্ভব না। অত টাকা মা-বাবার কাছ থেকে নেয়া সম্ভব না। বন্ধুর বাড়ি আবার চট্টগ্রাম। কক্সবাজার গেলে হোটেলে ট্যাকা দেয়া লাগবে না। “বন্ধুর মামার বন্ধুর” হোটেল। আর কী লাগে! বুধবার টিকেট কাইটা ফেললাম। বৃহস্পতিবার রাতে বাস।

বাস কাউন্টার বাসার অতি কাছে। হেঁটে গেলে ৫ মিনিটও লাগে না। বাস ছাড়তে দেরি নাই। রিক্সা নিতে গেল মেজাজ খারাপ হয়ে। আমাদের রিক্সা চালকগণ সম্ভবত ইকোনমিক্সের ডিমান্ড-সাপ্লাই-প্রাইস নিয়ে ভালো ধারণা পেয়ে গিয়েছেন। ২০ টাকার নিচে তারা যাবেন না। একজন তো ৩০ টাকা চেয়ে বসলেন। আমি আবেগে কাঁইন্দালাইলাম। হাঁটতে হাঁটতে পান্থপথের বাস কাউন্টারে পৌঁছালাম অবশেষে।  সেখান থেকে রাজারবাগ। এরপর শুরু হলো মূল যাত্রা। বাস ভ্রমণ আমার জন্য আনন্দদায়ক কিছু নয় কখনই। তা সে যতই এসি হোক, আর যাই হোক। এই বাস জিনিসটা সারা রাস্তা প্রতিটা মূহুর্তে তার গতি এবং দিক পরিবর্তন করে করে আমার মাথা ধরায় দিবে। এরপরও দাঁতে দাঁত চেপে এগোতে লাগলাম। প্রথম যাত্রা বিরতি হলো কুমিল্লার অফবিট রেঁস্তোরায়। অত্যন্ত সুস্বাদু খিচুড়ি দিয়ে ভোর রাতের খাওয়া সারলাম। এরপর চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে চলতে লাগলাম। আস্তে আস্তে রাতটা আলো ফুটে দিন হয়ে গেল। চলছি আর চলছি। চট্টগ্রাম শহর পার হয়ে চলে যাচ্ছি। চকরিয়ার আগে আগে আবার যাত্রা বিরতি নেয়া হলো। এরপর সোজা কক্সবাজারের পথে। সামনে শুধু রাস্তা আর রাস্তা। পাহাড়ি পথ। রাস্তা উঠে আর নামে। এ পথের শেষ নামাটা খুব সুন্দর। কলাতলী পয়েন্টে একটা ঢালটা পার হলেই সামনে সৈকতে আছড়ে পড়া সুবিশাল বঙ্গোপসাগর।

Coxs-bazar-the-worlds-Longest-Beach-22

Cox's Bazar, Beach

কক্সবাজার পৌঁছে উঠলাম বন্ধুর মামার বন্ধুর হোটেলে। মনে খুব প্রশান্তি। ভাড়া লাগবে না। গোসল করে একটা ঘুম দিয়ে বিকেলে বের হয়ে গেলাম সমুদ্র দেখতে। প্রথমে অবশ্য দুপুরের খাবারটা খেলাম ধানসিঁড়ি রেঁস্তোরায়। লইট্টা ফ্রাই আর গরুর মাংস দিয়ে জম্পেশ খাওয়া হলো। খাওয়া শেষে সমুদ্র সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে চলে গেলাম। ৪ বছর পর আবার দেখলাম নিজের দেশের এই ভালোবাসার সমুদ্রকে। ৩০ টাকা দিয়ে একটা কাউচ ভাড়া করে বসলাম ৩ বন্ধু। সমুদ্র দেখতে দেখতে আবিষ্কার করলাম সমানে চোখে বালু প্রবেশ করছে। কে বা কারা লাত্থি মেরে মেরে এ কাজ করে চলেছে। বাধ্য হয়ে চোখ বন্ধ করে সমুদ্র উপভোগ শুরু করলাম। খুব একটা ভালো লাগছিল না আসলে। এর মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেল। সৈকত থেকে ফিরে এসে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার প্যাকেজগুলোর খোঁজ-খবর নিলাম। সিদ্ধান্ত যখন প্রায় নিয়ে নিলাম যে সেন্ট মার্টিন যাবো তখন টং দোকানের এক ছেলে এ আবহাওয়ায় নিষেধ করলো সেখানে যেতে। তার প্রতি কৃতজ্ঞতা থাকবে সব সময়। অতঃপর রিক্সা নিয়ে লাবণী পয়েন্টে গেলাম। সন্ধ্যার পর মানুষ তেমন নেই সৈকতে। আস্তে আস্তে এগিয়ে গেলাম সমুদ্রের দিকে। হঠাৎ করে অনুভব করলাম ভালো লাগার অনুভূতিটাকে। মাথার উপরে চাঁদ, চাঁদের আলোয় ক’টি মেঘ আর সামনে বিশাল সমুদ্র। শীতল বাতাস বয়ে আসছে ক্রমাগত। পায়ে ঠেকছে সাগরের ঠান্ডা পানি। কক্সবাজার আসা সে মূহুর্তে সার্থকতা লাভ করলো। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে। পানির নিচ থেকে বালু সরে যাওয়া উপভোগ করলাম। ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগলাম দক্ষিণ দিকে। ৩ জনই গলা ছেড়ে গান ধরলাম। কোনো গানই বাদ পড়ে নি। আইয়ুব বাচ্চু, তাহসান থেকে শুরু করে পৌঁছে গেলাম ব্রায়ান অ্যাডামস আর রিচার্ড মার্ক্সে। কর্কশ কণ্ঠে গান অনেক হলো কিন্তু সাগর পাড়ে চাঁদের আলোয় রবী ঠাকুর আর কাজী নজরুলকে ছাড়া চলে নাকি!! শুরু হলো নজরুলের আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন। এরপর রবী বাবুর আমারও পরাণ যাহা চায়। নিজেদের গান শুনে ততক্ষণে আমরা নিজেরাই মুগ্ধ!

(চলবে)

Sunday, April 6, 2014

কীভাবে অনলাইনে ভারতের ভিসার জন্য আবেদন করবেন- ২য় পর্ব

ভিসার আবেদন করতে হলে আপনাকে অবশ্যই ভারতে কারো রেফারেন্স দিতে হবে। ভ্রমণের উদ্দেশ্যে গেলে হোটেলে নাম, ঠিকানা ও ফোন নম্বর প্রয়োজন হবে। একই সাথে বাংলাদেশেরও একজনের রেফারেন্স দিতে হবে। এরপর ৩য় পৃষ্ঠার কাজ শেষ করে নেক্সট দিলে আপনার দেয়া সকল তথ্য একটি পূরণকৃত ফরমে দেখাবে। একদম নিচে থাকবে দু’টি বোতাম, modify/edit এবং verified and continue। তথ্যগুলো দেখে সংশোধনের প্রয়োজন হলে modify বোতামে চেপে আবার সংশোধণের সুযোগ পাবেন আর সব ঠিক থাকলে verified and continue বোতামে চেপে পরের পৃষ্ঠায় যেতে হবে। এই পৃষ্ঠায় আপনি ভারতে গেলে যেখানে থাকবেন সেখানকার জায়গা/হোটেলের নাম, ঠিকানা, রাজ্যের নাম এবং জেলার নাম দিতে হবে। যেমন- আপনার হোটেল কোলকাতায় হলে হোটেলের নাম, ঠিকানা এবং রাজ্যের নাম হিসেবে West Bengal এবং জেলার নাম হিসেবে দিতে হবে Kolkata. শেষে দিতে হবে ফোন নাম্বার। কয়েকটি হোটেলের নাম, ঠিকানা দেয়ার অপশন থাকলেও একটির বেশি দেয়ার প্রয়োজন নেই। এরপর continue বোতামে চাপলে Date and Time Allotment to Applicant নামে একটি পাতা আসবে। সেখানে আপনার নাম এবং ওয়েব ফাইল নাম্বার বলে একটি নাম্বার দিবে। এই নাম্বারটা অবশ্যই লিখে রাখতে হবে। যদি আপনাকে সময় দেয়া হয় তাহলে পেইজের একদম নিচে ডানদিকে সময় ও তারিখ লেখা থাকবে আর যদি সময় না দেয়া হয় তাহলে লেখা থাকবে No appointment dates are available. এক্ষেত্রে লেখার প্রথমে দেয়া লিংকে গিয়ে পেইজের নিজের দিকের reprint registered application বোতামে ক্লিক করে প্রথমে ক্যাপচা পূরণ করতে হবে। এরপর সাবমিট বোতামে ক্লিক করে পরের পাতায় গিয়ে যে ভারতীয় মিশনে আপনি আবেদন করছেন সেটি নির্বাচন করে, ওয়েব ফাইল নাম্বার, জন্ম তারিখ, পাসপোর্ট নাম্বার দিয়ে আরেকটি ক্যাপচা পূরণ করে reprint বোতামে ক্লিক করলে একটি পিডিএফ ফাইল খুলবে যার ডানদিকে আপনার সাক্ষাতকারের সময় লেখা থাকবে। ফাইলটি কম্পিউটারে সেইভ করে রাখবেন। আর যদি তারিখ না থাকে তাহলে বুঝতে হবে সাক্ষাতকারের জন্য কোনো সময় খালি নেই।

10154333_10203387860994239_760129560_n

সময় খালি পাবেন সে আশা করাও ঠিক নয়। কারণ ওদের সার্ভারে সময় খালি না থাকার বলার জন্যই কমান্ড দেয়া থাকে। দিনের অজানা কোনো সময় অল্প কয়েক মিনিটের জন্য সার্ভার খোলা রাখে যখন আবেদন করলে সময় পাওয়া যায়। কিন্তু এ তথ্য কেউ জানে না। এ কারণে কিছু দালাল রয়েছে যাদের কাজই হলো অর্থের বিনিময়ে আপনাকে ভিসার জন্য ভারতীয় দূতাবাসে সাক্ষাতকারের জন্য আপনাকে তারিখ পাইয়ে দিবে। সেক্ষেত্রে উপরের প্রক্রিয়ায় পুরো আবেদনপত্র পূরণ করে তারিখ না পেলে দালালকে আপনার পাসপোর্ট নাম্বার, জন্ম তারিখ, ওয়েব ফাইল নাম্বার দিয়ে দিলে তারা সারাদিন ধরে চেষ্টা করে তারিখ পাইয়ে দেয়। সেজন্য তারা ৩০০ থেকে শুরু করে ১০০০ বা ১৫০০ টাকা নিয়ে থাকে। অনেকজনের ভিসার কাজ দিলে তারা টাকা কম নেয়। সাধারণত ৭০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যেই নেয় মাথাপিছু। আর নিজে যদি আপনি তারিখ ও সময় পেয়ে যান তাহলে তো কেল্লা ফতে। তারিখ পাওয়ার পর নির্ধারিত দিনে আপনাকে দূতাবাসে যে সকল কাগজপত্রের ফটোকপি ও আসল কপি নিয়ে যেতে হবে তা হলো-
১। সাক্ষাতকারের তারিখ লেখা পিডিএফ ফাইলটির প্রিন্ট করা কপি
২। পাসপোর্ট
৩। ইউটিলিটি বিল
৪। জাতীয় পরিচয়পত্র/ জন্মনিবন্ধন সনদ
৫। ২”/ ২” সিল-ছাপ্পড়, স্বাক্ষর না করা সদ্য তোলা রঙিন ছবি ৪ টি
৬। অফিস/ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া পরিচয়পত্র
৭। প্রতিষ্ঠান থেকে দলগত ভ্রমণ বা চিকিৎসার উদ্দেশ্যে গমন হলে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত প্রয়োজনীয় সুপারিশের কাগজ

ভিসা প্রক্রিয়ার খরচ ৪০০ টাকা। আর ভ্রমণের উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে চাইলে নূন্যতম ১৫০ ডলার পাসপোর্টে এনডোর্স করিয়ে নিতে হবে। অনেক সময় তারা বিগত ৩ বা ৬ মাসের ব্যাংক স্টেটমেন্টও চেয়ে থাকে।

Saturday, April 5, 2014

কীভাবে অনলাইনে ভারতের ভিসার জন্য আবেদন করবেন- ১ম পর্ব

বিভিন্ন প্রয়োজনে আমাদের ভারত যেতে হতে পারে। চিকিৎসা, ভ্রমণ হলো সাধারণ কিছু কারণ। আর অনেকের তো বিয়ের কেনাকাটা কোলকাতা থেকে করতে না পারলে জীবনই বৃথা। এছাড়া অনেকের আত্মীয়-স্বজন আছে সে দেশে। আমাদের দেশের তিনদিকে ভারত হওয়ায় স্থলপথে নেপাল কিংবা ভুটান যেতে হলেও ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিতে হয়। যেকোনো দেশের ভিসা পাওয়ার চেয়ে এখন ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর অন্যতম কারণ প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যাওয়ার জন্য আবেদন করে থাকেন। এক সময় ভারতীয় হাইকমিশনের সামনে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল নিতে হতো। এখন অনলাইনে আবেদন করে সাক্ষাতের তারিখ নিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সাথে নিয়ে ভারতের হাইকমিশনে হাজির হতে হয়। আজকে আলোচনা করবো কীভাবে অনলাইনে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করতে হয় তা নিয়ে।

প্রথমেই http://indianvisaonline.gov.in/visa/ এই পেইজে গিয়ে Online Visa Application Registration বাটনে ক্লিক করলেই ফরম চলে আসবে। ফরমের উপরের দিকে Temporary Application ID বলে একটা নাম্বার দেয়া থাকবে। ফরম পূরণের আগেই নাম্বারটি লিখে রাখুন। কেননা ফরমের কিছু অংশ পূরণ করে পরে বাকিটা পূরণ করতে চাইলে ঐ আইডি ব্যবহার করে যতটুকু আগেই করে রেখেছেন তার পর থেকে বাকিটা পূরণ করা যাবে।  বিভিন্ন ঘর পূরণ করতে গিয়ে আমাদেরকে বেশকিছু সংশয়ের মধ্যে পড়তে হয়। সেজন্য খুব মনোযোগ দিয়ে ফরম পূরণ করা জরুরি। প্রথম পৃষ্ঠার সবগুলো আবশ্যিক ঘর পূরণ না করে আপনি পরবর্তী পৃষ্ঠায় যেতে পারবেন না। একদম প্রথম ঘরে আপনি বাংলাদেশে ভারতের কোন মিশন অফিসে থেকে আবেদন করছেন তা নির্বাচন করবেন। ওখানে অপশনের মধ্যে ঢাকা, চিটাগাং এবং রাজশাহী রয়েছে। আপনি আপনার নিকটস্থ মিশন নির্বাচন করবেন। এরপর আপনার নাম, জন্ম তারিখ, জন্মস্থান (জেলার নাম) এগুলো পূরণ করে citizenship/national id নম্বরের ঘরে যাবেন। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর অথবা জন্মনিবন্ধন সনদের Personal Identification Number টি দিবেন। অর্থাৎ, পাসপোর্টে ব্যক্তিগত নম্বরের ঘরে যে সংখ্যাটি থাকে সেটিই দিতে হবে। কেননা পাসপোর্টের ঐ সংখ্যাটি আসলে আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র আর তা না থাকলে জন্ম নিবন্ধন সনদ থেকেই নেয়া হয়। Visible Identification Mark এর ঘরে আপনাকে দেখেই খুঁজে পাওয়া যায় এমন কোনো চিহ্নের উল্লেখ করবেন যেমন- মুখের কোনো কাটা দাগ, তিল, জন্মদাগ বা হাত কিংবা পায়ের নিচের দিকের কোনো দাগ যা সহজেই দেখা যায়। এরপর আপনাকে পাসপোর্টে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এখানে মনে রাখতে হবে, আপনার পাসপোর্ট যদি মেশিন রিডেবল হয়, তাহলে আপনি বাংলাদেশের যে অঞ্চল থেকেই পাসপোর্ট সংগ্রহ করুন না কেন Place of Issue হবে ঢাকা।

Online_Indian_Visa_Form_-_2014-04-05_16.03.4822222

প্রথম পৃষ্ঠা পূরণ শেষে একটি ক্যাপচা পূরণ করে ২য় পৃষ্ঠায় যেতে হবে। সেখানে রয়েছে আপনার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা লেখার ঘর। বর্তমান ঠিকানা ও স্থায়ী ঠিকানা এক হলে বর্তমান ঠিকানা লিখে একটা জায়গায় রয়েছে টিক চিহ্ন দেয়ার সেখানে ক্লিক করলেই স্থায়ী ঠিকানার ঘর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পূরণ হয়ে যাবে। এরপর আপনার মা-বাবার নাম ও বিস্তারিত লেখার ঘর আসবে। তারপর একটা অপশনে রয়েছে যে আপনার নানা-নানী, দাদা-দাদী কি পাকিস্তান বা পাকিস্তানের দখলকৃত অঞ্চলের নাগরিক বা সেখানে বাস করতেন কিনা। এখানে No দেয়াই শ্রেয়। এখানে পাকিস্তান বলতে পাকিস্তানই বোঝানো হয়েছে। ৭১ এর আগের পূর্ব পাকিস্তানকে নির্দেশ করা হয় নি। মা-বাবার জন্মস্থান বলতে জন্মের জেলাকে বোঝানো হয়েছে। Occupation Detail of Applicant অংশে আপনার পেশার বিস্তারিত দিতে হবে। তবে আপনি ছাত্র হলে যখন Student নির্বাচন করবেন তখন আরেকটি অপশন আসবে আপনার বাবা অথবা স্বামী/স্ত্রী’র পেশার বিস্তারিত দেয়ার জন্য বলা হবে। বাবা মৃত হলে এবং আপনি অবিবাহিত হলে বাবার শেষ পেশা, চাকরি/ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের নাম ও ঠিকানা দিতে হবে। আর Designation অংশে Retired লিখে এরপর পদের নাম লিখতে হবে। বাবা অবসরে থাকলেও একই কথা প্রযোজ্য। তৃতীয় পৃষ্ঠায় আপনার ভিসার ধরণ, ভিসার মেয়াদ, ভ্রমণের উদ্দেশ্য সংক্রান্ত অপশন নির্বাচন করতে হবে। কোন পথে ভারতে প্রবেশ করবেন এবং কোন পথে বের হবেন তাও আপনাকে নির্বাচন করে দিতে হবে। আকাশপথ হলে by air দিতে হবে। যেমন- বেনাপোল দিয়ে যদি আপনি বাংলাদেশ থেকে বের হন তাহলে port of entry দিতে হবে By road Haridaspur. ওদিক দিয়ে বের হলেও একই। আর বুড়িমারী দিয়ে বাংলাদেশ দিয়ে বের হলে দিতে হবে by road Changrabandha.     (চলবে)