Tuesday, December 10, 2013

মানব ক্লোনিং

প্রথমেই জেনে নেই ক্লোনিং কি ?

ক্লোন হল কোন জীব বা কোষ বা বৃহৎ জৈব অণুর হুবুহু নকল।
কোন জীবের একটি দেহকোষ হতে হুবুহু ঔ জীবটিকে পুনরায় তৈরি করার পদ্ধতি ক্লোনিং নামে বিখ্যাত (আণবিক জীববিজ্ঞানীরা দৈনন্দিন আরেক প্রকার ক্লোনিং করে থাকেন যা হল ডি এন এ ক্লোনিং)। ১৯৯৬ সালে রোজলিন ইনস্টিটিউট, স্কটল্যান্ডের গবেষক, ড: আয়ান উইলমুট, তার ২৭৩ তম চেষ্টায় একটি ভেড়ার একটি দেহকোষের (স্তনবৃন্ত বা বাঁট থেকে সংগৃহীত) কেন্দ্রকে অন্যধরনের ভেড়ার কেন্দ্রবিযুক্ত ডিম্বাণুতে প্রতিস্থাপিত করেন ও তা হতে প্রথম ধরনের সম্পূ্র্ণ ভেড়া ডলিকে তৈরি করে জীব ক্লোনিং এর সফল সুচনা করেন। এর মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বিরাট বিপ্লবের সূচনা হবে বলে অনেকে আশা করছে। যদিও মানব ক্লোনিং অধিকাংশ দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। (উইকিপিডিয়া)

এবার আসা যাক মানব ক্লোনিঙ এ । ক্লোনিং এর ছোটখাট ইতিহাস সবারই জানা তাই সেইদিকে বিস্তর গেলাম না । মানব ক্লোনিং বলতে বুঝায় একটি মানুষের হুবুহু জ়েনেটিক প্রতিকৃতি তৈরী করা।কৃত্তিম উপায়ে মানুষ তৈরী বুঝাতে ক্লোনিং শব্দটি ব্যবহৃত হয়।ক্লোনিং শব্দটি এসেছে একটি গ্রীক শব্দ “trunk branch” থেকে যার অর্থ গাছের একটি শাখা থেকে আরেকটি শাখা তৈরী করা।
মানব ক্লোনিং সাধারনত দুই প্রকারের-
১) থেরাপিউটিক ক্লোনিং (therapeutic cloning)
২) রিপ্রোডাকটিভ ক্লোনিং (reproductive cloning)

থেরাপিউটিক ক্লোনিং বলতে কি বুঝায় ?
থেরাপিউটিক ক্লোনিং বলতে বুঝায় একজন পুর্নবয়স্ক মানুষের কোষ থেকে অনুরুপ কোষ তৈরী এবং তা ঔষধশিল্প এবং গবেষনার কাজে ব্যবহার করা।
অন্যদিকে রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং বলতে কৃত্তিম মানুষ তৈরী করা বুঝায়, যা এখনো পর্যন্ত সফল হয়নি এবং বিভিন্ন দেশে এর প্রাকটিস নিষিদ্ধ।

এছাড়াও আরো এক প্রকারের ক্লোনিং সম্পর্কে জানা যায়, যার নাম রিপ্লেসমেন্ট ক্লোনিং, এর মাধ্যমে একটি রোগাক্রান্ত বা নষ্ট অঙ্গকে ক্লোনিং প্রকৃয়ায় তৈরী অন্য একটি অঙ্গ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।
তবে মানব ক্লোনিং অনেক দেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে । ১২ ই ডিসেম্বর ২০০১ সালে জাতিসংঘ প্রথম রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং এর বিরুদ্ধে আইন পাশে করে।২০০৬ সালের ডিসেম্বর এ অস্ট্রেলিয়ায় মানব ক্লোনিং নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়,যদিও দেশটিতে কিছু কিছু ক্ষেত্রে থেরাপিউটিক ক্লোনিং কে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ১৯৯৮, ২০০১, ২০০৪, এবং ২০০৭ সালে united states house of representative রা ভোট দিয়ে তাদের দেশে সকল প্রকার ক্লোনিং কে নিষিদ্ধ ঘোষনা করেন।

এবার আসা যাক কিভাবে ক্লোনিং করা হয় ?

রিপ্রোডাক্টিভ ক্লোনিং প্রকৃয়ায় তৈরীকৃত প্রানীর DNA হুবুহু তার মাতৃ প্রানীর DNA’র মতই হবে। আর এর জন্য ডিম্বানুর DNA বহনকারি নিউক্লিয়াসকে অন্য একটি প্রানীর DNA দ্বারা প্রতিস্থাপন করতে হবে।তারপর এই ডিম্বানুটিকে কোষ বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে একটি পরিপুর্ন দেহকোষে পরিণত হওয়ার জন্য গবেষনাগারে রেখে দেয়া হয়, অথবা এটিকে কোন নারীর জরায়ুতেও প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
থেরাপিউটিক ক্লোনিং সাধারনত বিভিন্ন স্টেম সেল তৈরী করতে ব্যবহৃত হয়।এই স্টেম সেলগুলো পরবর্তিতে শরীরের যে কোন কোষের মধ্যেই বৃদ্ধি্লাভ করতে পারে।বিজ্ঞানীরা মনে করেন এই স্টেম সেল দিয়ে বিভিন্ন ধরণের রোগ যেমন হার্ট ডীজিজ, আলঝেইমার ডিজিজ কে চিকিতসা করা সম্ভব।

ক্লোনিং নিয়ে বিতর্ক

মানব ক্লোনিং নৈতিকভাবে ঠিক কি না, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। ভেড়ার ক্লোনিংয়ের মাধ্যমে ডলির জন্মের পর থেকে তা আরও বেড়েছে। তবে মার্কিন চিকিৎসক পানাইওটিস জাভোস বলছেন, দু-এক বছরের মধ্যেই এ বিতর্কের অবসান হবে। জন্ন নেবে বিশ্বের প্রথম ক্লোন শিশু। ব্রিটিশ সংবাদপত্র ইনডিপেনডেন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন। জাভোস দাবি করেন, তিনি ১৪টি মানব ভ্রূণ ক্লোন করেছেন। এর মধ্যে ১১টি ভ্রূণ চারজন নারীর গর্ভাশয়ে প্রতিস্থাপন হয়েছে। তবে এঁদের কেউই গর্ভবতী হননি। এঁদের একজন ছিলেন ব্রিটেনের। ক্লোন শিশু জন্নদানের বিষয়ে তাঁরা বেশ আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষাটি আপাত সফল হয়নি। জাভোস জোর দিয়ে বলেন, ত্বকের কোষ থেকে ক্লোন শিশু তৈরির ক্ষেত্রে এটি ছিল প্রথম অধ্যায়। এ ছাড়া ওই চার নারী কেন গর্ভবতী হননি, তাও আমাদের জানা। তাই বলা যায়, আমাদের চেষ্টাকে আরও জোরদার করতে পারলে দু-এক বছরের মধ্যেই প্রথমবারের মতো ক্লোন শিশু জন্ন নেবে। সাইপ্রাস বংশোদ্ভুত মার্কিন নাগরিক জাভোস মধ্যপ্রাচ্যে গোপন কোনো স্থানে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে মানব ক্লোন নিয়ে গবেষণা নিষিদ্ধ। তবে তিনি ইতিমধ্যে তিনজন মৃত মানুষের ভ্রূণের ক্লোনও করেছেন। এদের মধ্যে ১০ বছরের একটি শিশু ছিল। কাডি নামের এ শিশুটি যুক্তরাষ্ট্রে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিল। শিশুটির রক্তের কোষ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে জাভোসের কাছে পাঠানো হয়েছিল। বন্ধ্যত্ব দুরীকরণের চিকিৎসায় নিয়োজিত মূলধারার বিশেষজ্ঞরা জাভোসের এসব দাবি মানতে নারাজ। ক্লোনের কৌশলটি নিরাপদ কি না, তা নিয়ে এসব বিশেষজ্ঞ প্রশ্ন তুলেছেন। ইম্পিরিয়াল কলেজ লন্ডনের লর্ড উইনসটন বলেন, ‘জাভোসের দাবির বিজ্ঞানভিত্তিক কোনো প্রমাণ আমরা এখনো পাইনি।’ তবে জাভোস জানান, মানব ক্লোনবিরোধী নীতির কারণে কয়েকটি বিজ্ঞান সাময়িকী তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ ছাপতে রাজি হয়নি।

প্রথম যখন ক্লোনিং করে ভেড়া শিশুর জন্ম দেয়া হয় , তখন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীরাই এ তথ্য প্রকাশ করেছিলেন যে, এর আগে তাদের ব্যর্থতার সংখ্যা ছিল ২৭৬। ২৭৬ বার যদি ভেড়া শিশুর জন্ম প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়ে থাকে তাহলে মানব শিশুর ক্লোনিংয়ের ব্যর্থতারও তো একটি সংখ্যা থাকবে । তো , জন্মের পথে কিংবা জন্মের পর পূর্ণাঙ্গতার ক্ষেত্রে যতগুলো ব্যর্থতা কিংবা ভুল হবে এসব মানব প্রাণের দায় কে নেবে? সর্বোপরি প্রশ্ন দেখা দেবে এ নতুন মানব সন্তানের পিতৃ,মাতৃ, বংশ ও ঐতিহ্য পরিচয় নিয়ে। বলা কঠিন হবে যে, এ ব্যক্তিটি কে? তার ব্যক্তিত্বের সংকট বা পার্সনালিটি ক্রাইসিস কীভাবে মোকাবেলা করা হবে? এরপর আসবে একটি অমানবিক নিষ্ঠুরতা যে, একটি ক্লোন মানবের জন্মদিবসেই হবে তার মুল উৎস ব্যক্তিটির সমান বয়স। শৈশব, কৈশোর ও ক্রমবিকাশের মধুর মানবিকতা থেকে সে হবে বঞ্চিত। কী কঠিন সমস্যা! এছাড়া সামাজিক, পেশাগত, রাজনৈতিক পরিচয়, পিতৃত্ব, পুত্রত্ব বা আত্মীয়তার সকল বন্ধনের মূল ব্যক্তিটি এবং তার কোষসঞ্জাত নতুন মানুষটি বা মানুষগুলোর সহাবস্থান কেমন হবে? কোন নৈতিকতার ভিত্তিতে হবে?কিছু সাধারণ প্রশ্ন থেকেই যায়,

১.মানব সন্তানের বংশ ও পিতৃ-মাতৃ পরিচয়
২.সামাজিক ও উত্তরাধিকারিক সংকট।

কিন্তু মানব শিশুর জন্মপ্রক্রিয়ার বাইরেও প্রকৃতিতে উদ্ভিদসহ নানা প্রজাতির বংশবৃদ্ধির পদ্ধতিতে যে বৈচিত্র রয়েছে এসব আমরা সচরাচর খেয়াল করি না বলেই ক্লোনিং আমাদের কাছে এত অভিমত আর বিস্ময়কর মনে হচ্ছে। মূলত বীজ বা চারা রোপণ ছাড়া ঠিক যেভাবে কলাগাছ থেকে নতুন গাছের জন্ম হয় , আলুর টুকরা থেকে আলুর চাষ কিংবা পাথরকুচি পাতার প্রতিটি কোণ থেকে শিশু গাছ জন্মায়, জীব জন্তু বা মানব ক্লোনিং বিষয়টিও এ প্রাকৃতিক সম্ভাব্যতারই একটি নমুনা মাত্র । অর্থাৎ মানব ক্লোনিং একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া যা প্রকৃতি বিরুদ্ধ নয় । কিন্তু এক্ষেত্রে বিপর্যয়ের সম্ভাবনাও কম নয় ।

এছারাও ক্লোনিং এর কিছু এরর বা ত্রুটি আছে,

১) সল্প জীবনঃ US department of energy ‘র মতানুসারে একটি সফল ক্লোন বানাতে ১০০ টি ট্রান্সফার প্রসেস দরকার হয়। এর ফলে ক্লোনটির বেশিদিন বেঁচে থাকার গেরান্টি থাকেনা।এছাড়াও ক্লোন মানবদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে ফলে তারা সহজেই বিভিন্ন রোগ-জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়।
২) অকার্যকর জীনোমঃ ক্লোন মানবদের জীনোম অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সঠিকভাবে কাজ করেনা, ফলে ক্যন্সার ছাড়াও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
৩) ইম্প্রিন্টিং ইররঃ সাধারন যৌন প্রজননের ক্ষেত্রে বাবা মা দুজনের দেহ থেকেই ডিএনএ সন্তানের দেহে ট্রান্সফার হয়, এবং কেবলমাত্র একটি জীন ই কার্যকর থাকে।কিন্তু যেহেতু ক্লোন মানবের ক্ষেত্রে জীন শুধু একজনের কাছ থেকেই আসে সেহেতু তার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অস্বাভাবিকতা পরিলক্ষিত হয়।

এছাড়াও আরো বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে যা কোনভাবেই কাম্য নয়।
ইভোলিউশনের কারনে আজ মানুষ প্রানীজগতের সরবশ্রেষ্ঠ আসনে আছে কিন্তু আসলেই কি মানুষ সরবশ্রেষ্ঠ ? মানুষ জ্ঞানের দিক দিয়ে হয়তো শ্রেষ্ঠ কিন্তু মানব সভ্যতার ইতিহাস দেখলে বুঝা যায় যে তা আসলে সংঘাত আর রক্তক্ষয়ের ইতিহাস । বিজ্ঞানের মতো একটা পবিত্র বিষয়কে তারা সবসময়ই ধ্বংসের কাজে ব্যাবহার করেছে । ক্লোনিং যেমন এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে তেমনি খুলে দিয়েছে এক অন্ধকার জগতও । ক্লোনিং এ মানুষ যখন আরো দক্ষ হয়ে উঠবে তখন এমন হতে পারে মানুষ চলে যেতে পারে অমরত্মের দিকে । চিরকাল টিকে থাকার বাসনা সবার মনেই থাকে । অন্য দিকে রাজনৈতিক নেতারা সবসময়ই বিজ্ঞানকে তাদের স্বার্থে ব্যাবহারের চেষ্টা করেন । অপরাধ জগতও বিজ্ঞান ব্যবহারের দিক দিয়ে পিছিয়ে নেই । ক্লোনিং যেমন পারে আরেকজন আইনস্টাইন তৈরি করতে তেমনি পারে আরেকটা হিটলার তৈরি করতে । আর আমরা বরাবরই দেখে এসেছি ভালোটার চেয়ে খারাপটার প্রভাবই বেশি পরে । আর মানব ক্লোনিং অন্য দিক দিয়ে আবার দাস ব্যাবসার দিকে মানুষকে ঝুকিয়ে দিতে পারে । কারন ক্লোনকৃত মানুষটিকে সাধারণ মানুষের মত বিবেচনা করা হবে নাকি ক্লোন হসেবে বিবেচনা করা হবে । তার পরিচয় কি হবে। এইরকম আরো নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এই ক্লোনিং ।
আশা করি সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে মানব ক্লোনিং এক যুগান্তকারী অবদান রাখবে ভবিষ্যত পৃথিবীতে । নব নব দ্বার খুলে দিবে আমাদের সামনে ।

তথ্যসূত্র ঃ উইকিপিডিয়া

1 comment: