Wednesday, December 11, 2013

ফুগু – পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ

১৭৭৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। এদিন লেখা ক্যাপ্টেন কুকের লগবুক থেকে জানা যায়, আগের দিন রাতে জাহাজের নাবিকরা সমুদ্র থেকে কিছু মাছ ধরেন। মাছগুলো কাটার পর নাড়িভুঁড়িগুলো খেতে দেন জাহাজে রাখা শূকরগুলোকে। রাতের খাবার খাওয়ার পর পরই নাবিকেদের শরীর অবশ হয়ে আসে, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়। সাথে প্রচন্ড পেট ব্যাথা, মাথা ব্যাথা আর বমি। নাবিকরা বুঝতে পারেন, তারা ভুল করে বিষাক্ত মাছ খেয়ে ফেলেছেন। সারা রাত ছটফট করে সকালের দিকে তারা মোটামুটি সুস্থ্য অনুভব করেন। শূকরগুলোর অবস্থা দেখার জন্য তারা খোঁয়াড়ে যান, সেখানে সবগুলো শূকর মরে পড়ে আছে। নাবিকরা অল্পের জন্য তারা বেঁচে গেছেন। যে অংশগুলো তারা ফেলে দিয়েছিলেন সেগুলোতেই সবচেয়ে বেশী বিষ ছিল। যে মাছ নিয়ে এই ঘটনা তার নাম ফুগু (Fugu) - পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ!

ফুগু জাপানি শব্দ, অর্থ ‘নদীর শূকর’। এর আরেক নাম পাফার ফিস (Puffer Fish). পাফার ফিস বা ফুগু হচ্ছে আমাদের দেশীয় পটকা মাছের একই বংশীয় আত্মীয়! ফুগুর ফুগুর শরীরে রয়েছে ভয়ঙ্কর বিষ টেট্রোডোটক্সিন (C11H17N3O8). টেট্রোডোটক্সিন সংক্ষেপে TTX নামে পরিচিত। TTX পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষ, পটাশিয়াম সায়ানাইডের চেয়েও এই বিষ এক হাজার গুণ বেশী বিষাক্ত। এখন পর্যন্ত এর কোন প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয় নি। রান্না করলে বা আগুনে ঝলসালেও এই বিষের প্রভাব বিন্দু মাত্রও কমে না। শরীরে TTX থাকার কারণে ফুগু হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিষাক্ত মাছ। শুধু তাই নয়, মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে ফুগু দ্বিতীয় বিষাক্ততম প্রাণী। একটি ফুগু মাছে যে পরিমান বিষ আছে তা দিয়ে ত্রিশ জন সুস্থ-সবল মানুষকে সহজেই মেরে ফেলা সম্ভব! ফুগু মাছের বিষ মাত্র এক গ্রাম পরিমাণ সংগ্রহ করে তা দিয়ে পাঁচশ মানুষকে অনায়াসে মেরে ফেলা সম্ভব! মানুষকে মেরে ফেলার ভয়াবহ ক্ষমতার জন্য জাপানের কানসাই (Kansai) এলাকার মানুষজন ফুগুকে ডাকে ‘Teppo’ নামে। অর্থাৎ – ‘পিস্তল।’

TTX মানব দেহের কোষ পর্দার সোডিয়াম চ্যানেল বন্ধ করে দেয় ও স্নায়ুতন্ত্রে ব্লক সৃষ্টি করে। ফলে মস্তিষ্কের সাথে শরীরের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। দেহ প্রথমে অবশ ও পরে প্যারালাইসিস হয়ে যায়। ডায়াফ্রাম অসাড় হয়ে যাওয়ায় শ্বাসতন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আক্রান্ত ব্যাক্তি দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পরে।

ফুগুর শরীরে বিষের পরিমাণ মাছের জাত, ভৌগলিক অবস্থান, ঋতু ও খাদ্যের উপর নির্ভর করে। ফুগুর শরীরে সবচেয়ে বেশী বিষ থাকে যকৃতে। তাছাড়া ডিম্বাশয়, হৃদপিন্ড, নাড়ীভূড়ি ও চোখেও প্রচুর বিষ থাকে। কিছু কিছু জাতের চামড়াতেও বিষ থাকে। জাপানের ‘ফুগু রিসার্চ ইন্সটিটিউট’ - এর গবেষণা মতে, ফুগু খেয়ে আক্রান্তদের মধ্যে ৫০% যকৃত, ৪৩% গর্ভাশয় আর ৭% চামড়া খেয়ে বিষ ক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। প্রজনন ঋতুতে ফুগু মাছে বিষের পরিমাণ বেড়ে যায়। জাতের দিক থেকে সবচেয়ে বেশী বিষাক্ত টোরাফুগু (Torafugu). টোরাফুগু অর্থ Tigerfugu বা বাঘাপটকা!

ফুগুর বিষে আক্রান্ত হলে তিন থেকে ত্রিশ মিনিটের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিবে। বিষ বেশী পেটে গেলে বিশ মিনিট থেকে আট ঘন্টার মধ্যে নিশ্চিত মৃত্যু। মৃত্যু হবে কী হবে না বা খাওয়ার কতক্ষণ পর হবে - সেটা নির্ভর করে কী পরিমাণ বিষ পেটে গেছে তার উপর। বিষে আক্রান্ত হওয়ার প্রথম উপসর্গ দেখা দেয় জিভ ও ঠোঁটে। প্রথমে জিহ্বা ও ঠোঁট শিরশির করে ও পরে অবশ হয়ে যায়, হাত-পা অবশ হয়ে আসে। হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, প্রকট শ্বাস কষ্ট হয়।

দ্বিতীয় পর্যায়ে, আক্রান্ত ব্যাক্তি প্যারালিসিসে আক্রান্ত হয়। তার মস্তিষ্ক পুরো সচল থাকে। সে বুঝতে পারে সে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হচ্ছে, আশেপাশে কি হচ্ছে সবই সে বুঝতে পারে; কিন্তু, শরীরের কোন অংশই সে নাড়াতে পারে না বা কথা বলতে পারে না। এ অবস্থাকে বলা হয় কোমা। ফুগু বিষে আক্রান্ত হয়ে সাত দিন পর্যন্ত কোমায় থাকার রেকর্ড আছে। ফুগুর যেহেতু কোন প্রতিষধক নেই তাই পেট ওয়াশ করাই হচ্ছে এর প্রধান চিকিৎসা। আক্রান্ত ব্যক্তিকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বিষ ক্রিয়ার প্রভাব কাটে।

মজার ব্যাপার হল, জাপানিরা এই ভয়ঙ্কর বিষাক্ত ফুগু মাছের বিষ আলাদা করে খাওয়া শিখেছে। জাপানে সবচেয়ে দামী আর অভিজাত খাবার হচ্ছে ফুগু মাছের নানান পদ! প্রতি বছর জাপানিরা প্রায় ১০,০০০ টন ফুগু মাছ খায়। রেস্টুরেন্টে একজনের জন্য একটি ফুগু পদের দাম পড়বে ২,০০০ থেকে ৫,০০০ ইয়ান, অর্থাৎ প্রায় ২০ থেকে ৫০ ডলার! জাপানে ফুগু আহরণ ও বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফুগু কাটাকুটি আর রান্না করার জন্য জাপানে লাইসেন্সধারী আলাদা বাবুর্চি রয়েছে। খোলা বাজারে আস্ত ফুগু বিক্রি নিষিদ্ধ। সরকারি লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানকর্তৃক প্রক্রিয়াজাত করা বিষমুক্ত ফুগুর মাংশ প্যাকেট করে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। ফুগু প্রক্রিয়াজাত করতে বাধ্যতামূলকভাবে ৩০টি ধাপ মেনে চলতে হয়। ১৯৫৮ সাল থেকে শুধুমাত্র ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং সার্টিফিকেটধারী ব্যক্তিরাই ফুগু কাটাকুটি আর রেস্টুরেন্টগুলোতে রান্না করতে পারে। জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে তাদেরকে লিখিত ও ব্যবহারিক মিলিয়ে তিনটি কঠিন পরীক্ষা দিয়ে এই সার্টিফিকেট অর্জন করতে হয়।

রেস্টুরেন্ট আর ফুগু প্রক্রিয়াজাত করা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ফুগুর বিষাক্ত অংশগুলো বিশেষ একটি পলিথিন ব্যাগে ভরে লকারে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। তারপর বেশ কিছু বিষাক্ত বর্জ্য জমা হলে সেগুলোকে একত্র করে পাঠানো হয় চুল্লিতে, সেখানে বর্জ্যগুলোকে তেজষ্ক্রিয় বর্জ্যের মত করে উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।

১৯৫০ সাল ছিলো জাপানের জন্য একটি ভয়াবহ বছর। শুধু এই এক বছরেই ফুগু খেয়ে জাপানে মারা যায় ৪০০জন, অসুস্থ হয় ৩১,০৫৬ জন। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ায় দুর্ঘটনা অনেক কমে যায়। তবু, ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত জাপানে ফুগু বিষে আক্রান্ত হয় ৬৪৬ জন। এদের মধ্যে মারা যায় ১৭৯ জন। জাপানে এখনও প্রতি বছরই কমপক্ষে ২০ টি ফুগু বিষক্রিয়ার খবর পাওয়া যায়। আক্রান্তদের ৬০% মারা যায়। এসব মৃত্যুর প্রায় সবগুলোই ঘটে জেলেপল্লীতে জেলেরা নিজেরা নিজেরা ফুগু প্রস্তুত করতে গিয়ে ঠিক ভাবে প্রস্তুত করতে না পেরে, আর দুর্ঘটনা ঘটে আইনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সার্টিফিকেটবিহীন বাবুর্চিকে দিয়ে ফুগু প্রস্তুত করতে গিয়ে।

সম্প্রতি, নাগাসাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন, Pseudomonas নামক ব্যাকটেরিয়াযুক্ত স্টারফিস, শেলফিস খাওয়ার কারণে ফুগুর দেহে TTX বিষ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা নিয়ন্ত্রিত খাবার খাইয়ে ৪,৮০০টি টোরাফুগু জাতের বিষমুক্ত ফুগু উৎপাদন করতে পেরেছেন। জাপানে এখন বিভিন্ন ফার্মে বিষমুক্ত ফুগু চাষ করার হিড়িক পড়ে গেছে!

যে ফুগু নিয়ে এত মাতামাতি তার স্বাদ আসলে কেমন? Noel Vietmeyer নামের একজন ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিনে লেখেন, ‘আহামরি কিছু না! আঁশ নেই, আঠালো জেলির মত। স্বাদে হালকা। স্বাদটা অনেকটা মুরগীর বাচ্চার মত, সামুদ্রিক নোনতা স্বাদযুক্ত।’ কিন্তু, এই ফুগুর মাংশ খেয়েই তৃপ্তিতে জাপানিরা প্রেমে ব্যর্থ হওয়ার কষ্ট পর্যন্ত ভুলে যেতে পারে। ফুগু নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতাটি লিখেছেন জাপানি কবি Yoso Buson (১৭১৬-১৭৮৩). কবিতাটি একটি তিন লাইনের হাইকু কবিতা-

I cannot see her tonight.
I have to give her up.
So, I will eat Fugu.

কবিকে বালিকা পাত্তা দেয় না! দেখা করার শত চেষ্টা করেও কবি এক রাতে বালিকার সাথে দেখা করতে পারলেন না। কবি সিদ্ধান্ত নিলেন, অহংকারী বালিকাকে মন থেকে মুছে ফেলবেন! আর, মুছে ফেলার কষ্ট ভোলার জন্য খাবেন সুস্বাদু ফুগু!

2 comments: